বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিই বুদ্ধপূর্ণিমা নামে খ্যাত। এ দিনে সিদ্ধার্থ গৌতম হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত শাক্যরাজ্যে রাজপুত্র রূপে জন্মগ্রহণ করেন। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে তিনি একই তিথিতে বুদ্ধগয়ার বোধিবৃক্ষমূলে বোধিজ্ঞান বা বুদ্ধত্ব লাভ করেন। আশি বছর বয়সে একই পূর্ণিমা তিথিতেই কুশীনগরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বৌদ্ধ ধর্মীয় ভাষায় এটিকে মহাপরিনির্বাণ বলে। গৌতম বুদ্ধের মহাজীবনের এই তিনটি মহান ঘটনা বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে সংঘটিত হয়েছিল। তাই বৈশাখী পূর্ণিমাকে বুদ্ধপূর্ণিমাও বলা হয়। বৌদ্ধদের কাছে এ পূর্ণিমার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জাঁকজমকের সাথে বৌদ্ধরা বুদ্ধপূর্ণিমা পালন করে থাকে।

সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সূত্র পাঠ ও বুদ্ধকীর্তনের মাধ্যমে প্রভাতফেরি করে বুদ্ধপূর্ণিমা উৎসবের সূচনা হয়।
আগের দিন বৌদ্ধবিহারগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নানা রকম ফুল, পাতা ও রঙিন কাগজ দিয়ে সাজানো হয়। এভাবে অনুষ্ঠানে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়। পূর্ণিমার দিন সকালে বুদ্ধপূজা, সমবেত উপাসনায়, পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ করা হয়। দুপুর বারোটার আগে ভিক্ষুসঙ্ঘকে দুপুরের আহার দান করা হয়, যা পিন্ডদান নামে পরিচিত। দায়ক-দায়িকরাও দুপুরের আহার সম্পন্ন করে বৌদ্ধবিহারে ধ্যান সমাধি করেন। বিকালে ধর্মসভা হয়। এতে গৌতম বুদ্ধের জীবন, ধর্ম, দর্শন বিষয়ে আলোচনা হয়। সন্ধ্যায় প্রদীপ পূজা, বুদ্ধকীর্তন হয়। আজকাল অনেক বৌদ্ধবিহারে এ উপলক্ষে রক্তদানের ব্যবস্থা করা হয়। অনেকে মরণোত্তর চোখ দান করার প্রতিশ্রুতি দেন, যা অন্ধের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করে। সন্ধ্যায় অনেক বৌদ্ধবিহারে ভক্তিমূলক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ সমস্ত অনুষ্ঠানে বৌদ্ধ ছাড়াও অন্যান্য ধর্মের লোকেরাও অংশগ্রহণ করে। বিশেষ করে ধর্মালোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকেরা অংশগ্রহণ করে। এতে সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি গড়ে ওঠে, পরস্পরের প্রতি মৈত্রীভাব সৃষ্টি হয়।
বুদ্ধপূর্ণিমা তিথিতে সংঘটিত বুদ্ধের জীবনের তিনটি প্রধান ঘটনা প্রকৃতির সাথে সম্পৃক্ত। এ ঘটনাগুলো রাজপ্রাসাদের বাইরে প্রকৃতির মনোরম পরিবেশে, উন্মুক্ত আকাশের নিচে ঘটেছিল। যেমন: জন্ম হয়েছিল লুম্বিনী কাননে। এটি বর্তমানে নেপালের অন্তর্গত। গাছপালা তরুলতায় ভরা ছিল লুম্বিনী কানন। বুদ্ধত্ব লাভ হয়েছিল গয়ার উন্মুক্ত বোধিবৃক্ষমূলে। এটি বর্তমানে ভারতের বিহার প্রদেশের অন্তর্গত গয়া জেলায় অবস্থিত।
মহাপরিনির্বাণ হয়েছিল হিরণ্যবতী নদীর তীরস্থ কুশিনগরের জোড়া শালবৃক্ষের মূলে। তাই প্রকৃতির প্রতিও মৈত্রী প্রদর্শন করতে হবে। বিনা প্রয়োজনে গাছের পাতা ছেঁড়া ও ডালপালা কাটা উচিত নয়। বিদ্যালয় ও বাড়ির আঙিনার আশেপাশে গাছের পরিচর্যা করা সকলের উচিত। প্রকৃতির সাথে আমাদের জীবনের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। আন্তর্জাতিকভাবে এ দিবসটি 'বৈশাখ ডে' নামে উদ্যাপিত হয়।
অনুশীলনমূলক কাজ |
Read more